লিভার তথা যকৃত মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি মানবদেহের সবচেয়ে বড় সলিড অর্গেন।  দেখতে গাঢ় বাদামী এই অঙ্গটির ওজন একজন মানুষের ওজনের প্রায় দুই শতাংশ তথা প্রায় সোয়া থেকে দেড় কিলোগ্রাম। এই অঙ্গটির অবস্থান পেটের ডান দিকের উপরিভাগে বক্ষপিঞ্জরের নিচ অংশ থেকে মধ্যভাগে বক্ষপিঞ্জরের খানিকটা অংশ জুড়ে বিস্তৃত। লিভার মানবদেহে জানা এবং অনেকাংশে অজানা এ ধরণের প্রায় পাঁচশত এর বেশী গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে। লিভারের নানাবিধ কাজের মধ্যে অন্যতম হল শরীরে বিষক্রিয়া করতে পারে এমন খাদ্য, ওষুধ ও রাসায়নিক দ্রব্যকে বিষমুক্ত করা ও শরীরের জন্য ব্যবহার উপযোগী করে তোলা, শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ, প্রোটিন ও লিপিডের বিপাকে অংশগ্রহণ করা, শকরা, কতিপয় ভিটামিন এবং আয়রণ সঞ্চিত রাখা, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য বিভিন্ন উপাদান তৈরী করা এবং রক্ত জমাট বাঁধা ও রক্তকে তরল রাখার প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরী করা। সুতরাং শারীরবৃত্তীয় কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে বজায় রাখতে লিভারের সুস্থতা অপরিহার্য। লিভারকে সুস্থ রাখার জন্য প্রয়োজন জীবাণুমুক্ত, পরিমিত এবং সুষম খাবার গ্রহণ এবং যে সকল  খাবার, পানীয় ও ওষুধ লিভারের ক্ষতি করতে পারে তা থেকে বিরত থাকা। পাশ্চাত্যে অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের কারণে লিভারে ফ্যাট জমা হয়ে অ্যাকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজের প্রাধান্য দেখা যায়। আমাদের দেশে দূষিত পানি গ্রহণের কারণে ‘এ’ এবং ‘ই’ ভাইরাস জনিত হেপাটাইটিস অন্যতম প্রধান লিভার রোগ। এছাড়া, আধুনিক দ্রুত গতির জীবনযাত্রায় ফাস্টফুড সংস্কৃৃতির প্রসারের কারণে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণের অভ্যাস বৃদ্ধি পাওয়ায় নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাচ্ছে। সুতরাং, লিভারের সুস্থতার জন্য খাদ্যাভ্যাসের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরী। আলোচ্য প্রবন্ধে লিভারের কাজ, দৈনন্দিন জীবনে আমাদের গৃহীত খাদ্যের উপাদান, লিভারের সুস্থতার জন্য সুষম খাদ্য, বিভিন্ন লিভার রোগের কারণ হিসেবে খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব এবং লিভারের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কিভাবে খাবেন সে সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

লিভার আমাদের শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ এবং লিভারকে ভালো রাখতে হলে দরকার উত্তম খাদ্যাভ্যাস।

 

আমরা কী খাই

আমরা প্রতিনিয়ত যে খাবার গ্রহণ করি তা মূলত ছয়টি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত থাকে কার্বোহাইড্রেট তথা শর্করা, প্রোটিন তথা আমিষ, ফ্যাট তথা চর্বি, ভিটামিন, মিনারেলস এবং পানি।  এর মধ্যে শর্করা, আমিষ এবং চর্বি মুখগহবর, পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রে পরিপাক হয়ে যথাক্রমে গ্লুকোজ, পেপটাইড ও অ্যামাইনো এসিড এবং ফ্যাটি এসিডে রূপান্তরিত হয়। পরে উক্ত উপাদানগুলো খাদ্যনালী থেকে হজম হয়ে রক্তের মধ্য দিয়ে লিভারে প্রবেশ করে। এছাড়াও অন্যান্য উপাদান যেমন ওষুধ ও অন্যান্য পরিবেশগত রাসায়নিক পদার্থ কিছুটা পরিবর্তিত বা অপরিবর্তিত অবস্থায় রক্তে প্রবেশ করে।

 

শর্করা জাতীয় খাবারের মধ্যে আছে ভাত, রুটি, আলু, ভুট্টা, মিষ্টি (সুক্রোজ), দুধ (ল্যাকটোজ) ও ফল। আমিষ জাতীয় খাবারের মধ্যে আছে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও কলিজা এবং ডাল, মটরশুটি, ছোলা ও বাদাম। চর্বি জাতীয় খাবারের মধ্যে আছে রান্নায় ব্যবহূত তেল, মাছ, মাংস ও দুধের সাথে সংশ্লিষ্ট তেল, মাখন, পনির ও ঘি এবং এসব দিয়ে তৈরী খাবার। যেমন : কেক, বিস্কিট, চকলেট ও চিপস। চর্বি বা ফ্যাট আবার দুই রকমের: স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং আন-স্যাচুরেটেড ফ্যাট। রান্নার সময় তেল পুনঃ পুনঃ ফুটালে তা আন-স্যাচুরেটেড থেকে স্যাচুরেটেড ফ্যাট-এ পরিণত হয়। এছাড়াও আছে কোলেস্টেরল। ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে আছে সবুজ ও রঙিন শাক-সবজি ও বিভিন্ন ফল।সাধারণত আমরা খাদ্য গ্রহণের সময় খাদ্যের মৌলিক উপাদানগুলোকে আলাদাভাবে গ্রহণ করি না।  আমরা যা খাই তাতে উপাদানগুলো বিভিন্ন অনুপাতে মিশ্রিত থাকে এবং বিভিন্ন জটিল গঠনে উপস্থিত থাকে। যেমন: আমরা ডিম দিয়ে রুটি খেলে মূলত সবগুলো মৌলিক উপাদানই একসাথে গ্রহণ করছি। কেননা- ডিমের কুসুমে আছে চর্বি ও সাদা অংশে আমিষ, ডিম ভাজা হয়েছে লবণ ও তেল দিয়ে, রুটিতে আছে স্টার্চ (এক ধরণের জটিল শর্করা) এবং গ্লুটেইন (এক ধরণের আমিষ)। আবার, চিকেন ফ্রাই খেলে খাওয়া হচ্ছে প্রোটিনের সাথে বেশী পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও কোলেস্টেরল। অন্যদিকে, দুধ ও দুধের তৈরি খাবার খেলে একই সঙ্গে শর্করা, আমিষ, চর্বি ও ক্যালসিয়াম পাচ্ছি।  খাদ্য থেকে আমরা যে শক্তি পাই তাকে পরিমাপ করা হয় ক্যালরী দিয়ে। এক গ্রাম শর্করা ও আমিষ থেকে আমরা প্রায় চার কিলোক্যালরী এবং এক গ্রাম চর্বি থেকে প্রায় ৯ কিলোক্যালরী শক্তি পাই।

 

অতিরিক্ত ক্যালারি আমাদের লিভারে কি পরিবর্তন আনে

শর্করা, আমিষ ও চর্বিসহ প্রতিটি মৌলিক উপাদানই আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু আমাদের লিভারের তথা শরীরের সুস্থতা নির্ভর করছে আমরা খাদ্যগুলো কি অনুপাতে গ্রহণ করছি তার ওপর। যেমন: একজন ব্যক্তি যদি এক মাস দিনে প্রতিবেলায় ফাস্টফুড (স্যান্ডউইচ, চিকেন ফ্রাই প্রভৃতি) গ্রহণ করে তাহলে তার শরীরের ওজন বেড়ে যাবে এবং লিভারে চর্বি জমে যাবে। মর্গান স্পারলোক নামক একজন ব্যক্তি ২০০৪ সালে একটি ডকুমেন্টারী তৈরী করেন যার নাম ‘সুপার সাইজ মি’। ডকুমেন্টারীতে তিনি নিজেই দিনের প্রতিটি খাবার গ্রহণ করেন ম্যাকডোনাল্ড-এ। মাস শেষে তার ওজন ২৪ পাউন্ড (প্রায় ১১ কেজি) বেড়ে যায়। ডাক্তাররা তার রক্তে চর্বির মাত্রা এত বেশী পান যে লিভারের নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ থেকে লিভার প্রদাহ হওয়ার আশংকা প্রকাশ করেন। একটি সুইডিশ রিসার্চেও একই ধরণের ফলাফল পাওয়া গেছে। দেখা গেছে যে ব্যক্তিদের দিনে দুবার ফাস্টফুড গ্রহণ করতে বলা হয়েছিলো তাদের রক্তে এএলটি নামক এনজাইমটি দ্রুত বেড়ে গেছে, যা লিভার প্রদাহের নির্দেশক।  অর্থাত্, অল্প কিছু দিন শরীরের জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যালরী সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করলে তা লিভারের ফ্যাট হিসেবে জমা হয়ে ফ্যাটি লিভার ডিজিজ-জনিত লিভার প্রদাহ করতে পারে।

 

আমাদের প্রতিদিনের শক্তি ব্যয়ের পরিমাণ নির্ভর করছে আমরা দৈনন্দিন কি ধরণের কাজ করি তার ওপর। যারা অফিসে ডেস্কে বসে কাজ করে এবং যারা রৌদ্রদগ্ধ মাঠে কৃষি কাজ করে তাদের পরিশ্রমের মাত্রায় পার্থক্য আছে। সুতরাং, কাজ ভেদে আমাদের ক্যালরী গ্রহণেও তারতম্য থাকতে হবে। যাদের জীবনযাত্রায় কায়িক পরিশ্রমের মাত্রা কম (সিডেনটারী লাইফস্টাইল) তাদের দৈনন্দিন সর্বোচ্চ ২০০০ ক্যালরী সমমানের খাবার গ্রহণ করলেই চলে। প্রতিদিন এর চেয়ে বেশী ক্যালরী গ্রহণ করলে অতিরিক্ত ক্যালরী শরীরের বিভিন্ন স্থানে এবং লিভারে চর্বি হিসেবে জমা হবে।

 

সুস্থ লিভারের জন্য সুষম খাবার

ব্রিটিশ লিভার ট্রাস্টের প্রকাশিত ‘ডায়েট ও লিভার ডিজিজ’ পুস্তিকা অনুযায়ী লিভারের সুস্থতার জন্য আমরা দৈনন্দিন খাদ্য তালিকাকে পাঁচটি গ্রুপ-এ ভাগ করতে পারি: স্টার্চ জাতীয় শর্করা (গ্রুপ এক), শাক-সবজি ও ফলমূল (গ্রুপ দুই), দুধ ও দুধের তৈরী খাবার (গ্রুপ তিন), প্রাণীজ, উদ্ভিজ ও দুধ-ব্যতীত অন্যান্য আমিষ (গ্রুপ চার) এবং অধিক চিনি ও তেল সমৃদ্ধ খাবার ও পানীয় (গ্রুপ পাঁচ)। এর মধ্যে গ্রুপ এক ও দুই দৈনন্দিন খাবারের এক-তৃতীয়াংশ করে এবং বাকী তিন গ্রুপ এক-নবমাংশ করে থাকবে।

 

গ্রুপ এক: স্টার্চ জাতীয় খাবারের মধ্যে আছে ভাত, রুটি, পাউরুটি, আলু, ভুট্টা, সেরিয়েল, নুডুলস ও পাস্তা। স্টার্চ এক ধরণের জটিল শর্করা। এটি ধীরে ধীরে হজম হয়। ফলে, একবার গ্রহণ করলে এটি দীর্ঘক্ষণ ধরে গ্লুকোজ সরবরাহ অব্যাহত রাখে।  তিন বেলার খাবারে স্টার্চ জাতীয় খাবারের যে কোন একটি বা একাধিক রাখা উচিত্। এতে একবার খেলে অনেকক্ষণ পেট ভরা ভরা লাগবে। এছাড়া ভাত-রুটির সাথে আমরা যে ভাজি, মাখন প্রভৃতি খাই তাতে আমাদের শরীরের তেলের চাহিদা মিটে যায়। তবে যাদের ওজন বেশী তাদের মেন্যুতে কম চর্বি যুক্ত খাবার রাখা দরকার।

 

গ্রুপ দুই: প্রতিদিন শাক-সবজি ও ফলমূলের পাঁচটি ‘পোরশন’ খাওয়া দরকার। এখানে এক পোরশন বলতে বুঝানো হচ্ছে ‘৮০ গ্রাম’ অথবা নিচের যে কোন একটি: ১৫০ মিলিলিটারের একগ্লাস ফলের রস, তিন টেবিল চামচ সবজি (রান্না করা বা কাঁচা), এক বাটি সালাদ, একটি কলা বা কমলা বা সম-আকারের ফল, অল্প কয়েকটি আঙ্গুর বা বড়ই।

 

গ্রুপ তিন: দুধ ও দুধের তৈরী খাবারে প্রচুর আমিষ ও স্যাচুরেটেড-চর্বি থাকে। এছাড়া আছে বেশী পরিমাণে ক্যালসিয়াম যা হাড়ের জন্য প্রয়োজন। প্রতিদিনের খাবারের এক-নবমাংশ এ জাতীয় খাবার থাকলেই যথেষ্ট।

 

গ্রুপ চার:প্রাণীজ আমিষ (মাছ, মাংস, ডিম) এবং উদ্ভিজ আমিষ (মটরশুটি, বাদাম, ছোলা) মাংসপেশী ও ব্রেইনের গঠনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খাদ্য। তিন বেলা খাবারের অন্তত দুই বেলা প্রাণীজ আমিষ থাকলে ভালো হয়। এছাড়া মটরশুটি, বাদাম, ছোলা প্রভৃতি খাবারে আমিষ ছাড়াও আছে ফাইবার, মিনারেলস এবং ভিটামিন।

 

গ্রুপ পাঁচ: বিস্কিট, কেক, পেস্ট্রী, কোক, পিজা, চিপস, চিকেন ফ্রাই প্রভৃতি খাবার এই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। এই খাবারে প্রচুর পরিমাণে চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। এজন্য এ খাবারগুলো খুব অল্প পরিমাণে খাওয়া উচিত্। মাঝে মাঝে কোন অনুষ্ঠান উপলক্ষে খাওয়া গেলেও প্রতিদিন এগুলো খাওয়ার সুযোগ নেই। তবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী যাদের ওজন বাড়ানো প্রয়োজন তারা এভাবে খাবার গ্রহণ করতে পারেন।

 

একজন সুস্থ মানুষের জন্য দৈনন্দিন খাবারের রুটিনটিকে উপরোক্ত খাদ্যতালিকা অনুযায়ী গুছিয়ে নিলে তার লিভারকে সুস্থ রাখা সম্ভব। এছাড়া, যে খাবারগুলোকে বিশেষভাবে লিভারের জন্য উপকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয় তার মধ্যে আছে- রসুন, গাজর, বিট, সবুজ চা, সবুজ শাক, বাধাকপি, ফুলকপি, আঙ্গুর, আপেল, জলপাইয়ের তেল, লেবু ও লেবুর শরবত, তেঁতুল ও কাঠবাদাম। এতে আছে প্রচুর পরিমাণে এন্টি-অক্সিডেন্ট, ফাইবার ও ভিটামিন সি যা লিভারকে বিষমুক্ত করার কাজে সাহায্য করে।

 

লিভারের বিভিন্ন রোগের জন্য দায়ী খাবার

লিভারের সবচেয়ে কমন রোগ হল হেপাটাইটিস ভাইরাস জনিত লিভার প্রদাহ। হেপাটাইটিস ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ এবং ‘ই’ ভাইরাস দিয়ে সাধারণত হেপাটাইটিস হয়। তন্মধ্যে হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ ছড়ায় দূষিত পানির মাধ্যমে। বর্তমানে শহরে   রাস্তার পাশে আখের রস, ফলের জুস ও লেবুর শরবত সহজলভ্য। কিন্তু এগুলো তৈরীতে যে পানি ব্যবহার করা হয় তার বিশুদ্ধতা প্রশ্ন সাপেক্ষ। সুতরাং হেপাটাইটিস থেকে মুক্ত থাকতে এ পানীয় পরিহার করা উচিত্। এছাড়া বাসাবাড়িতে ওয়াসা কর্তৃক সরবরাহকৃত পানি সেবন করার আগে ফুটিয়ে নেয়া জরুরী। অন্যদিকে গ্রামে-গঞ্জে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহূত পানি অনেক সময় পুকুর, খাল ও নদী থেকে সংগ্রহ করে না ফুটিয়ে ব্যবহার করা হয়। এতেও হেপাটাইটিস আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এ আশংকা থেকে বাঁচতে নলকূপের পানি ব্যবহার করা দরকার।

 

দূষিত পানীয় ও খাদ্যের মাধ্যমে Entamoeba histolytica নামক প্রোটোজোয়া এবং Echinococcus granulosus নামক পরজীবীও লিভারে বাসা বেধে যথাক্রমে অ্যামিবিক লিভার অ্যাবসেস এবং লিভার-এর হাইডাটিড সিস্ট করতে পারে। Entamoeba histolytica-এর সিস্ট দূষিত পানি বা খাবারের মধ্য দিয়ে মানুষের অন্ত্রে প্রবেশ করে এবং বৃহদান্ত্রে বাসা বেঁধে দীর্ঘদিন অবস্থান করতে পারে। পরবর্তীতে এটি অন্ত্রের প্রাচীরকে ভেদ করে শিরাপথে লিভারে প্রবেশ করে এবং লিভার কোষকে আক্রমণ করে পুঁজ তথা অ্যাবসেস করতে পারে।  Echinococcus granulosus-এর ডিমকে বলা হয় ওভা। ওভা আক্রান্ত ভেড়ার ভিসেরা থেকে কুকুরের পাকস্থলিত প্রবেশ করে। অতঃপর, উক্ত আক্রান্ত কুকুরের সংস্পর্শে মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া, পোষা কুকুর মাঠে ও শষ্যক্ষেতে চলাফেরা করার সময় মলত্যাগ করলে ফসল দূষিত হয় এবং তা খাদ্য হিসেবে গ্রহন করার মাধ্যমে মানুষের অন্ত্রে ওভা ছড়িয়ে পড়ে। ওভা মানুষের ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে শিরাপথে লিভারে প্রবেশ করে বাসা বাঁধে। দেখতে পানি ভর্তি থলের মত বাসাটিকে হাইডাটিড সিস্ট বলা হয়।  সুতরাং উপরোক্ত রোগদ্বয় থেকে মুক্ত থাকতে বিশুদ্ধ ও পরিষ্কার পানি ও খাবার গ্রহণ করতে হবে। শাকসবজি রান্না করার পূর্বে ভালোমত ধুয়ে নিতে হবে এবং পর্যাপ্ত তাপমাত্রায় রান্না করে খেতে হবে।

 

সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও এখন ব্যাপক হারে শিল্পায়ন চলছে। এরই প্রেক্ষিতে পাশ্চাত্যের সাথে যোগাযোগ বেড়ে যাওয়ায় এবং আকাশ সংস্কৃৃতির কারণে ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এদেশেও আশংকাজনক হারে বেড়ে চলেছে মদ তথা অ্যাকোহল সেবন। অ্যালকোহল যেহেতু নেশা সৃষ্টি করে সেহেতু অনেক সময়ই সেবনকারী গ্রহণযোগ্য মাত্রা অতিক্রম করে যায়। এভাবে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে লিভারে ফ্যাট জমা হয়ে অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ করে। অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ লিভার প্রদাহ (অ্যালকোহলিক হেপাটাইটিস) ও লিভার সিরোসিসের অন্যতম প্রধান কারণ। যারা প্রচুর মদ্যপান করে তাদের ৩৫ শতাংশ হেপাটাইটিস এবং ১০ থেকে ২০ শতাংশ লিভার সিরোসিস-এ আক্রান্ত হয়। তবে অ্যালকোহল সেবন থেকে বিরত থাকলে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।